৯০ এর দশকের বাংলাদেশের অনন্য এক অভিনয় প্রতিভার নাম খালেদ খান
নারায়ণগঞ্জের খবর প্রতিবেদকঃ ৯০ এর দশকে, বিটিভিতে প্রচারিত, অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাটক “রূপনগর” এর, তুমুল জনপ্রিয় এই ডায়ালগটি যার উচ্চারনে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তাঁর নাম খালেদ মাহমুদ খান যুবরাজ।

সবার প্রিয় খালেদ খান!
অত্যন্ত জনপ্রিয়, দর্শকনন্দিত, শক্তিশালী অভিনেতা খালেদ খান।
১৯৫৮ সালে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে জন্মগ্রহণ করা, খালেদ খান ২০১৩ সালে, মাত্র ৫৫ বছর বয়সে, নার্ভ এর সমস্যাজনিত জটিলতায়, ঢাকার বারডেম হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
বাংলাদেশের অনন্য এক অভিনয় প্রতিভার নাম খালেদ খান! ৮০ এর দশকের শেষের দিকে, বা ৯০ এর দশকে, যারা “এইসব দিন-রাত্রি” কিংবা “রূপনগর” ধারাবাহিক নাটক দেখেছেন, তাদের কাছে খালেদ খানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছুই নেই।
আর যারা বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের, ৮০/ ৯০ এর দশকের দর্শক, তাদের কাছে, খালেদ খান বিস্ময়কর এক অভিনয় প্রতিভার নাম।
খালেদ খানের শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইলে। পরে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে, ১৯৮১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিন্যান্স বিষয়ে স্নাতক ও এবং ১৯৮৩ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
★ খালেদ খানের পিতা নজরুল ইসলাম খান স্কুল মাস্টার ছিলেন। কিন্তু তিনি ফুটবল খেলা, অভিনয় ও গানে ভীষণ পারঙ্গম ও এলাকায় জনপ্রিয় ছিলেন। মা খালেদা বেগম গৃহিণী ও সংগীত অনুরাগী ছিলেন। নয় ভাই বোনের মধ্যে খালেদ খান সবার বড়। ভাই খালেদ খানের হাত ধরে শাহীন খানও অভিনয়ে এসেছিলেন। পরে পেশাগত কারণে আর ধরে রাখতে পারেননি। খালেদ খানের ছোট ভাই মামুন জাহিদ বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পী। খালেদ খানের স্ত্রী রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হক। তাঁর একমাত্র কন্যা জয়িতা, সেও সঙ্গীতের সাথে জড়িত।
★ কলেজে পড়ার সময় থেকেই, তিনি মঞ্চ নাটকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি, ১৯৭৫ সালে তিনি যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী মঞ্চ নাটকের দল, নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে।
খালেদ খান ১৯৮১ সালে “সিঁড়িঘর” নাটকের মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে তার অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু করেন। তিনি প্রথম দর্শকদের নজর কাড়েন, ধারাবাহিক নাটক “সকাল সন্ধ্যা”র মাধ্যমে। এরপর হুমায়ুন আহমেদের লেখা প্রথম ধারাবাহিক নাটক “এইসব দিন রাত্রি”তে অভিনয় করে নিজেকে একজন শক্তিধর অভিনেতা হিসেবে প্রমাণ করেন। মূলত মুস্তাফিজুর রহমান প্রযোজিত এই নাটকের মাধ্যমেই তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।
এরপর ধারাবাহিক নাটক “রূপনগর” এ, “হেলাল মাস্তান” চরিত্রে অভিনয় করলে, তার জনপ্রিয়তা আকাশ স্পর্শ করে।
ইমদাদুল হক মিলনের লেখা এবং শেখ রিয়াজ উদ্দিন বাদশা প্রযোজিত এই নাটকে তার অনেকগুলো সংলাপই খুবই জনপ্রিয়তা পায় এবং সবার মুখে মুখে ফিরতে থাকে।
যেমন, “ছি ছি ছি ছি ছি, তুমি এত খা*রাপ!”
কিংবা, “অন্যায়, খুব অন্যায়!” এই ডায়ালগগুলি।
★ তার উল্লেখযোগ্য টিভি নাটক গুলো হচ্ছে, “এইসব দিন-রাত্রি”, “কোন কাননের ফুল”, “রূপনগর”, “মহোৎসব সংবাদ”, “সকাল সন্ধ্যা, “একা একা”, “শিকল”, “পিঞ্জিরা”, “মহাপ্রস্থান”, “অচলায়তন”, “সুখের লাগিয়া”, “মোহর আলী”, “ইতি আমার বোন”, “নিঃশ্বাসে তুমি বিশ্বাসে তুমি”, “ফানুস”, “শীতের পাখি”, “দমন”, “লোহার চুড়ি”, “মৃ*ত্যু ও একটি প্রশ্ন”, “দক্ষিণের ঘর” ইত্যাদি।
নাটকের শক্তিমান এই অভিনেতা অভিনয় করেছেন দুইটি চলচ্চিত্রেও, আক্তারুজ্জামান পরিচালিত “পোকামাকড়ের ঘরবসতি” (১৯৯৬) এবং এনামুল করিম নির্ঝর নির্মিত চলচ্চিত্র “আহা” (২০০৭)।
খালেদ খান ৩০টিরও বেশি নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনা দিয়েছেন ১০টি নাটকে।
শিল্পকলার অভিনয় শাখায় তাঁর অবদানের জন্য, তাঁকে ২০২২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক “মরণোত্তর একুশে পদক” প্রদান করা হয়।

★ ব্যক্তি জীবনে, খালেদ খান ১৯৮৫ সালে সংসার পেতেছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী মিতা হক এর সঙ্গে।
মিতা হকও মাত্র ৫৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন ২০২১ সালে, স্বামী খালেদ খান (১৯৫৮-২০১৩) এর মৃত্যুর ৮ বছর পরে। মিতা হক করোনা, কিডনি জটিলতা এবং হার্ট এর সমস্যায় ভুগছিলেন।
তাদের একমাত্র কন্যা ফাহরিন খান জয়িতা। জয়িতাও একজন কণ্ঠশিল্পী।
★ খালেদ খান শুধু নামেই যুবরাজ নয়, তিনি তার কর্মেও ছিলেন আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনের একজন যুবরাজ! তাঁর অনন্য বাচনভঙ্গি এবং কণ্ঠস্বর তার অভিনয়ের মতোই এখনো আমাদের কানে বাজে। তিনি যে শুধু অভিনয় করতেন, তাই না। ছিলেন খুবই ভালো একজন আবৃত্তি শিল্পীও।
পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময়ে, চাকুরী ও শিক্ষকতা পেশায়ও ছিলেন।
২০০৯ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৫ সালে তিনি বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালে তিনি একুশে টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৯৭ সালে বেক্সিমকোফার্মার ইনচার্জ হিসেবে কাজ করেন।
প্রতিভাবান ও মেধাবী এই মানুষটির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা! আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন, প্রিয় যুবরাজ!
★ খালেদ খানের স্ত্রী, বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মিতা হকের পৈতৃক নিবাস গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড়গাঁও গ্রামে।
তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন।
তিনি ছায়ানটের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার নিজস্ব সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘সুরতীর্থ’ প্রতিষ্ঠা করেন।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২০ সালে একুশে পদক এবং ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদকে ভূষিত করে।
মিতা হক ২০২১ সালে ঢাকায় মৃ*ত্যু*বর*ণ করেন এবং পরবর্তীতে তাকে তার পৈতৃক গ্রাম কালীগঞ্জের বড়গাঁওয়ে মা-বাবার ক*ব*রে*র পাশে সমাহিত করা হয়।
অল্প সময়ের ব্যবধানে, একই ছাদের নীচ থেকে, পর পর আমরা হারালাম, আমাদের সাংস্কৃতিক অংগনের দু’টি নক্ষত্রকে। পার্থিব জগত থেকে হারিয়ে গেলেও, কোটি ভক্ত অনুরাগীর হৃদয়ের গহীনে, ঠিকই বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন যুগ যুগ ধরে এই তারকাযুগল।
ওপারে ভালো থাকুন আমাদের প্রিয় মানুষ দু’টি!
তথ্য সূত্র #actor #Bangladesh



